গুরুপূর্ণিমার প্রণাম: প্লেটো ও রাষ্ট্রের জাহাজ

ABVP 29 July, 2026
গুরুপূর্ণিমার প্রণাম: প্লেটো ও রাষ্ট্রের জাহাজ

কলমে: ডক্টর সুদীপ কুমার ভুঁই


আজ গুরুপূর্ণিমা। এই দিনে জগতের সকল মহাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে বিশেষভাবে মনে পড়ে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক Plato-র কথা। আড়াই হাজার বছর আগে তিনি মানবসমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির যে গভীর বিশ্লেষণ করেছিলেন, তার অনেক কথাই আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।

প্লেটো গণতন্ত্রের সমালোচক ছিলেন। কারণ তিনি জনগণকে ঘৃণা করতেন না; বরং তিনি জনমনের বিভ্রম, আবেগ এবং অজ্ঞতার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত রূপক "Ship of State" আজও রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম শক্তিশালী উপমা।

ভাবুন, উত্তাল সমুদ্রে একটি জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়েছে। চারদিকে বিপদ। অথচ জাহাজের নাবিকেরা তর্কে ব্যস্ত— কে হাল ধরবে! সমস্যা হলো, জাহাজ চালানোর প্রকৃত জ্ঞান তাদের কারও নেই। শেষ পর্যন্ত ভোট হলো। বিজয়ী হলো সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে সুন্দর বক্তৃতা দিতে পারে, সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, কিংবা বাকিদের মন জয় করতে পারে। আর যে নক্ষত্র দেখে পথ চিনতে জানে, যে প্রকৃত নাবিক, সে উপহাসের পাত্র হয়ে এক কোণে পড়ে রইল। ফল যা হওয়ার তাই— জাহাজ ডুবে গেল।

প্লেটোর মতে, যখন প্রজ্ঞার চেয়ে জনপ্রিয়তা বড় হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রও সেই জাহাজের মতোই বিপদের দিকে এগোয়। ইতিহাস সাক্ষী, এথেন্সের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটেই Socrates-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেখানে সত্য পরাজিত হয়েছিল সংখ্যার কাছে।

তবে প্লেটো স্বৈরতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন না। বরং তিনি আশঙ্কা করেছিলেন— অজ্ঞতার হাতে ক্ষমতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সীমাহীন ও নীতিহীন স্বাধীনতাও শেষ পর্যন্ত সমাজকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়। তখন দক্ষতা ও প্রজ্ঞার স্থান দখল করে জনপ্রিয়তার রাজনীতি; বাস্তবতার পরিবর্তে মানুষকে দেখানো হয় অবাস্তব স্বপ্ন। আর যখন সেই স্বপ্ন ভেঙে সমাজ ক্লান্ত ও অস্থির হয়ে পড়ে, তখনই শান্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আবির্ভূত হয় স্বৈরতন্ত্র।

তাই প্লেটো গণবিরোধী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিভ্রম-বিরোধী। তাঁর বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্র পরিচালনা এমন মানুষের হাতে থাকা উচিত, যাদের সেই দায়িত্ব পালনের জ্ঞান, চরিত্র এবং প্রশিক্ষণ রয়েছে।

আড়াই হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। সমুদ্র আজও উত্তাল। কেবল রাষ্ট্র নামের জাহাজটি যেন আরও জটিল স্রোত, আরও গভীর ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে দিয়ে পথ খুঁজছে।

গুরুপূর্ণিমার এই পবিত্র দিনে মানবসভ্যতার সকল জ্ঞানগুরু, সত্যসন্ধানী এবং প্রজ্ঞার সাধকদের প্রতি জানাই বিনম্র প্রণাম। তাঁদের চিন্তার আলো আমাদের বিবেক, বিচারবোধ ও মানবিকতাকে আরও আলোকিত করুক।

← হোম পেজে ফিরে যান