রাষ্ট্র পুর্নগঠনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রশক্তির ভূমিকা
[৯ ই জুলাই, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের স্থাপনা দিবসকে স্মরণে রেখে আলোচনাটি করেছেন ড. কল্যাণ চক্রবর্তী।]
গৃহে যেমন একটি ঠাকুরঘর থাকে। বিশ্বরূপ গৃহেও একটি ঠাকুরঘর আছে। উপাসনা-কক্ষটি হচ্ছে পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ। সাধুসন্তের দেশ, মহন্ত-মনীষীর দেশ। দর্শনের দেশ, প্রজ্ঞা এবং বোধাতীতানন্দের দেশ। এই ঠাকুরঘর বাঁচলে বিশ্ব বাঁচবে। সিস্টার নিবেদিতার মতে, ভারতবর্ষ না বাঁচলে বিশ্ব এক অমূল্য রতন হারাবে। ভারতবর্ষের মঙ্গলই বিশ্বের মঙ্গল। ভারতবর্ষ মোক্ষের দেশ, তার স্বরূপ গেরুয়া, মাস্তুল গৈরিক বর্ণ। তার হেডকোয়ার্টার ভারতবর্ষের মস্তিষ্কের মধ্যেই, মেরুদণ্ডের মধ্যেই; রাশিয়ায় নয়, চীনে নয়, কোরিয়ায় নয়, কিউবায় নয়। প্রাণভোমরা ভারতের মধ্যেই আছে।
একটি মেঠো কথা হল, "আগে দিয়ে বেড়া/তবে ধরো গাছের গোড়া।" আগে দেশের চারপাশে বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করতে হবে, দেশের সংস্কৃতি রক্ষা করতে হবে, তারপর 'বসুধৈব কুটুম্বকম' করতে হবে। ভারতবর্ষ নিজে আগে বাঁচবে, তবে না বাঁচাবে!
এবিভিপি-র প্রতিষ্ঠা দিবস ৯ ই জুলাই। এবিভিপি বা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ একটি সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৯ সালে এর প্রতিষ্ঠা। ৭৭ বছর ধরে এই সংগঠন দেশের পুনর্গঠনের দিকে, একটি সমৃদ্ধশালী আদর্শের দিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছে। বর্তমান প্রজন্মকে কুসংস্কারমুক্ত আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছে। শ্রেষ্ঠ ভারত গড়ার সংকল্পে এগিয়ে যেতে চেয়েছে। ছাত্রাবস্থা থেকে একটি হিতবাদী দৃষ্টান্ত স্থাপন তাদের উদ্দেশ্য। এই চাইবার পথ ধরে বিদ্যার্থী পরিষদ কেবল ভারতবর্ষের মধ্যে নয়, পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠনের শিরোপা লাভ করেছে। তারা বন্দেমাতরম ধ্বনিকে কাজে পরিণত করতে চেয়েছে, বলতে চেয়েছে Bandemataram in Action. সুজলাং সুফলাং শস্যশ্যামলাং ভারতমাতার বন্দনা। হাজার হাজার বিদ্যার্থী নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি 'ভারতমাতা'-র জয়ধ্বনি করে ভারতমাতার কাজে সামিল হয়েছে। কেরল থেকে কাশ্মীর, অরুণাচল প্রদেশ থেকে গুজারাট। সমগ্র ভারত জুড়ে তাদের ভূমিকা এবং সার্থকতা। শুভঙ্করী পথে যেতে কোন বাঁধা না মানার ঐতিহ্য, উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া অবধি আন্দোলন না থামার পারম্পর্য।
"Work that she may prosper. Suffer that she may rejoice." শ্রী অরবিন্দ তখন তিনি জাতীয় মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। ১৯০৬ সাল। বঙ্গভঙ্গের আন্দোলনে উত্তাল ভারতবর্ষ। বহু টাকার বেতন ছেড়ে জাতীয় মহাবিদ্যালয়ে যোগদান করতে এলেন শ্রীঅরবিন্দ, বিলেত থেকে পড়াশোনা করা তরতাজা এক যুবক।
তিনি ছাত্রদের বলছেন, পড়াশোনা করবে দেশের জন্য। If you will study, study for her sake. শরীর, মন, অন্তরাত্মাকে উপযুক্ত করবে দেশসেবার জন্য। train yourselves body and mind and soul for her service. You will earn your living that you may live for her sake. দেশের জন্য বেঁচে থাকতে আয় করবে। বিদেশে যাবে যাতে সেখান থেকে জ্ঞান নিয়ে এসে দেশের সেবায় লাগাতে পার। You will go abroad to foreign lands that you may bring back knowledge with which you may do service to her.
দু বছর বাদে ১৯০৮ সালে শ্রীঅরবিন্দ বলছেন, "Service of our motherland is our highest duty at this moment." মাতৃভূমির সেবাই এই সময়ে আমাদের সর্বোচ্চ কর্তব্য। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রেরও একই মত, "বিজ্ঞান অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজ নয়।"
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের বিখ্যাত অধ্যাপক, হিন্দু কেমিস্ট্রি গ্রন্থ প্রণেতা। তিনি স্বামী প্রণবানন্দজীকে সঙ্গী করে পূর্ববঙ্গে গিয়ে ছাত্রদের নিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণকার্য সংগঠিত করেছেন। ১৯২৫ সাল, যে বছর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রতিষ্ঠা, সে বছর ফরিদপুর জেলা ব্যবসায়ী সমিতির এক অধিবেশনে বলছেন, "আমি বরাবরই বলে থাকি দেশের ছাত্রদের এবং যুবকদের ওপরই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে -- তাঁরা যদি সঙ্গবদ্ধ হয়ে প্রতিজ্ঞা করেন যে দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি করবেন তা হলে সহজে তা করতে পারেন।.... যেটুকু শিখেছেন তা দেশের লোকের মধ্যে বিলিয়ে দেবেন। তাঁরাই আমাদের দেশের বহুকালের প্রচলিত বাক্য "বিদ্যা মহাধন কেহ নাহি নিতে পারে কেড়ে/যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে।"
জাতীয়তাবাদী ছাত্রশক্তির কাজ রাজনৈতিক সত্তা, বাহুবল, মিথ্যাপ্রচার, স্লোগান, পরনির্ভরতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না। পরিশ্রম, নিষ্ঠা, কর্তব্য সম্পাদনের মাধ্যমে তিল তিল করে গড়ে তুলতে হয়। ভারতীয় সংস্কৃতিকে মুছে ফেলতে যেখানে নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অশুভ শক্তি, দেশদ্রোহী শক্তি, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তার বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে হয়। তাদের হিংসামূলক কাজের সম্ভাবনা জরিপ করতে হয়। বাহুবল নয়, ভালোবাসা দিয়ে জাতীয়তাবাদের আদর্শে সদস্যতা করতে হয়। শৃঙ্খলার মধ্যে আনন্দধারায় বাঁধতে হয়। এ বাঁধন-বিহীন বন্ধন। দেশমাতৃকা তার জপমন্ত্র।
ভারতবাসীকে, বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিতে হবে ছাত্রশক্তি কোনো অসভ্যতামির পৃষ্ঠপোষক নয়, Student Power Nuisance power নয়। অনেক ছাত্র অনেক রাজনৈতিক দলের নেতাদের দ্বারা পোষা গুণ্ডার দল বৈকি কিছু নয়। অতীতে আমরা সাক্ষী যে ছাত্রদের অসীম জীবনীশক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে শাসক দল তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে, সেই রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে থাকে, পদলেহন করে। বিদেশি শক্তি ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করে যারা বিদ্যার্থীদের বিভ্রান্ত করে, তারা ছাত্রদের জন্য সম্পদ নয়। দেশের ক্ষতি চেয়ে যে সমস্ত রাজনৈতিক দলে বিদেশি হেডকোয়ার্টারের সমৃদ্ধি চায় এবং ছাত্রদের লেলিয়ে দেয়, তাদের চিহ্নিত করতে পারা, ছাত্রশক্তির প্রাথমিক কাজ। সজাগ থাকতে হবে কোন দল, কোন আদর্শ ছাত্রদের বিপথগামী করে তুলছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশবিরোধী, সমাজবিরোধী মানুষের মদত দেওয়ার নামই অনৈতিকতা। ছাত্রদের সঠিক আদর্শ, সঠিক দিশার প্রতি নাড়া বাঁধতে হবে। ইতিবাচক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, গঠনমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা, ভারতমায়ের গৌরববর্ধনের জন্য সদাসক্রিয় হওয়ার নামই জাতীয়তাবাদ।
একসময় ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল ছাত্রশক্তি। আজ সেই স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা, ভারতবর্ষের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার নাম জাতীয়তাবাদ। ছাত্রদের উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে লেলিয়ে দিয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে দেওয়া সহজ। তিল তিল করে গড়ে তুলতে হয় যে ল্যাবরেটরী, গবেষণা খামার, ক্লাসরুম ; তা হঠকারী আন্দোলনের নামে ভেঙ্গে যেতে দেখেছে রাজ্যবাসী। তারা ভেঙে, গুঁড়িয়ে দেওয়ার ইজমে বিশ্বাসী। হ্যাঁ, ভাঙ্গনের জয়গান গাইতে চেয়েছিলেন কবি, সেটা কোন ভাঙ্গন? সেটা অশুভ মানসিকতার ভাঙ্গন, সেটা ধ্বংসাত্মক শক্তির ভাঙ্গন, সেটা দেশবিরোধিতার ভাঙ্গন, সেটা বিকৃত সংস্কৃতির ভাঙ্গন। ছাত্রশক্তিকে যাবতীয় গড়ার কাজ করতে হবে। শুভঙ্করী মূল্যবোধ গড়ার কাজ, জনসম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ, জ্ঞান-মানস গড়ে তোলার কাজ, চরিত্র-গঠনের কাজ, একতা গড়ে তোলার কাজ। বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে জ্ঞান-চরিত্র-একতার গঠনপথ ভীষণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। গঠন সর্বস্তরে চাই, এবং গঠনের পর তা যাতে কোনো শক্তি ভাঙ্গতে না সাহস পায়, তার জন্য শক্তি-সংহতির কাজ করতে হবে রাষ্ট্রবাদী ছাত্রশক্তিকে।
নতুন ভারত গঠনে যেমন ছাত্রদের ভূমিকা থাকবে, তেমন শিক্ষকদেরও যথাযথ ভূমিকা ও দায়িত্ব থাকবে। ছাত্রদের ভাবজগতে গঠনমূলক পরিবর্তন আনার 'উসকো কাঠি' হবেন শিক্ষকেরা। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে অন্তরে-বাহিরে জাতীয়তাবাদী শিক্ষককে খোঁজার পথ জানতে হবে ছাত্রদের। জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন তার সুলুকসন্ধান দিতে পারে। বিদ্যায়তনে শিক্ষকেরা পাঠদান করেন, এটা সত্য, কিন্তু সেটাই শেষ নয়, অনুপ্রেরণা দান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদের কেবল ডিগ্রি লাভ নয়, 'বিকশিত' হয়ে ওঠার শিক্ষা ছাত্রজীবনের বড় পাওনা, বড় সার্টিফিকেট। কোন বিকাশ? বিকাশ মানে হল প্রসারণ, বিকাশ মানে হল বিস্তৃতি। মনের প্রসারণ। বড় মনের মানুষ হতে হবে। একসাথে বাঁচা আর একসাথে লড়ার সামর্থ্য জন্মাতে হবে। ব্যক্তিত্ব অর্জন করতে হবে।ব্যক্তিত্বের উত্তরণে শিক্ষক যোগ্য সহায়তা করবেন।
আমাদের রাষ্ট্রভক্তিতে পরিপূর্ণ হতে হবে। ভারত ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা। সমান সুখদুঃখের ভাবনায় গঠিত সমাজ। এক জীবনদর্শন, এক গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি, প্রাচীন আধ্যাত্মিক পরাম্পরা৷ ছাত্র ছাত্রীদের শারীরিক ক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে হবে। প্রাণশক্তির এক উচ্ছল ধারা থাকতে হবে।
"আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
‘মানুষ হইতে হবে’ – এই যার পণ৷"
কেমন মানুষ? কীভাবে কল্যাণ? জাতীয় আদর্শে প্রতিপালনের মাধ্যমে কল্যাণ হবে। ত্যাগ আর সেবা হল ভারতবর্ষের জাতীয় আদর্শ। ত্যাগ মানে হচ্ছে 'কাঁচা আমি' থেকে 'পাকা আমি'-তে চলে যাওয়া। ছোটো আমি থেকে বড় আমিতে রূপান্তরিত হওয়া। বলা হয়, "একান্ত মে সাধনা/লোকান্ত মে পরোপকার"। পরোপকারের জন্যই সেবা। সেবা হল পীড়িত মানুষকে ভালো রাখার সুযোগ পাওয়া। কেউ সেবা করার সুযোগ দিচ্ছেন বলেই সেবা করতে পারছি, এই বোধটা থাকা দরকার। জাতীয়তাবাদী ছাত্রেরা দাবী তুলুক প্রাথমিক শিক্ষা থেকে কৃষি, পশুপালন ও পরিবেশ শিক্ষা দেওয়া হোক।
বিশ্ব এখন গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ভারতবর্ষকেও অশান্ত করবার চেষ্টা প্রতিনিয়ত করতে চায় ভারত বিরোধী নানান সংগঠন। ভারতবর্ষের মধ্যে নানান সংগঠন ও ব্যক্তির মধ্যে আজও বিদেশি-মানসিকতা গেঁড়ে বসে আছে। আমাদের উচিত হবে দেশীয় জিনিসে সাধ্যমতো কাজ চালিয়ে যাওয়া। ছাত্রসমাজ এই স্বদেশী জাগরণের কাজটি করতে পারে। স্বদেশী জাগরণ ও আত্মনির্ভরশীল ভারত নির্মাণের কারিগর হতে পারে জাতীয়তাবাদী ছাত্রসমাজ।
যদি পড়াশোনা করে মূল্যবোধ তৈরি না হয়; যদি নির্ভীক, স্বাভিমানী, স্বাবলম্বী হতে না পারে; সেবাপরায়ণ, দেশভক্ত ভারতীয় নাগরিক হয়ে না উঠতে পারে, তবে সে শিক্ষা বৃথা। রাষ্ট্রবাদী ছাত্রসমাজ এমন শিক্ষা অর্জনের জন্য তদ্বির করবে যা জীবনের সমস্যাকে সাফল্যের সঙ্গে সমাধান করতে সক্ষম হয়। কোনো ছাত্র কেবল নিজে শিখবে না, অধীতজ্ঞান গৃহে, গ্রামে, গঞ্জে সফলভাবে যথাসাধ্য প্রয়োগ করবে। নীতিনিষ্ঠ সমাজ তৈরি করতে এগিয়ে আসবে। রাষ্ট্র-জীবনকে গৌরবশালী করবে। স্বধর্ম রক্ষা করবে। এই কাজে শিক্ষক ছাত্রকে সমভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে।
" ওঁ সহনাববতু সহনোভুনক্তু সহবীর্যং করবাবহৈ/ তেজস্বীনাবোধিতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ। / ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি।"
আমরা শিক্ষক-ছাত্র সমভাবে বিদ্যার্জন করব; সমভাবে বিদ্যার ফল লাভ করব; সকলে সুস্থ-সবল নীরোগ জীবনযাপন করব; কেউ কারো প্রতি বিদ্বেষী হব না; আমাদের মধ্যে সকল শান্তি-সুখ বিরাজিত হোক।
(ড. কল্যাণ চক্রবর্তীর পুরনো লেখা থেকে চয়িত)