আজ ৯ জুলাই। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ তথা এবিভিপি-র ৭৮তম প্রতিষ্ঠা দিবস। ভারতে এই দিনটি জাতীয় ছাত্র দিবস হিসেবেও পালিত হয়। প্রায় আট দশক পেরিয়ে আসা এই যাত্রা একটি সংগঠনের ইতিহাস মাত্র নয়, ভারতের ছাত্রসমাজ কীভাবে দেশ গড়ার কাজে নিজেকে যুক্ত করেছে, তারই একটি প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতার পরপরই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র রাজনীতির উপর বামপন্থী সংগঠনগুলির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছিল। দেশভাগের ক্ষত তখনও দগদগে, নতুন দেশ গড়ার কাজ সবে শুরু হয়েছে। এমন এক সময়ে ছাত্রশক্তিকে জাতীয় পুনর্গঠনের কাজে যুক্ত করার তাগিদ থেকে ১৯৪৮ সালে আরএসএস কর্মী বলরাজ মধোকের উদ্যোগে এবিভিপি-র কাজ শুরু হয়। পরের বছর, ১৮৬০ সালের সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, ১৯৪৯ সালের ৯ জুলাই সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়।
শুরুর দিকে সংগঠনের বৃদ্ধি ছিল ধীর। ১৯৫৮ সালে বোম্বাইয়ের অধ্যাপক যশবন্তরাও কেলকর সংগঠনের প্রধান দায়িত্ব নেওয়ার পর এবিভিপি নতুন গতি পায়, তাঁকেই এবিভিপি-র প্রকৃত রূপকার বলে গণ্য করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের যুবশক্তি ও চরিত্র গঠনের চিন্তাধারা কেলকরের হাত ধরে সংগঠনের মূল দর্শন হয়ে ওঠে, যেখানে চরিত্র, শৃঙ্খলা ও সেবার আদর্শ কেন্দ্রীয় স্থান পায়।
এবিভিপি-র ভাবনায় রাষ্ট্র একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, যেখানে প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পাশাপাশি চলে। অতীতের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে বাতিল না করে সামনে এগোনোর কাজে লাগানোর এই দৃষ্টিভঙ্গি সংগঠনের কাজকর্মে বারবার ফিরে এসেছে।
মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন সদস্য নিয়ে শুরু হওয়া এই সংগঠন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে সারা দেশে। ১৯৭৪ সালে সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার, ৭৯০টি ক্যাম্পাসে। ১৯৮৩ সালে তা বেড়ে হয় আড়াই লক্ষ, শাখার সংখ্যা তখন এগারোশো। আজ এবিভিপি ভারতের তথা বিশ্বের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন, সদস্যসংখ্যা প্রায় ষাট লক্ষ। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ না থাকলেও এবিভিপি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ পরিবারের অংশ, এবং নিজেকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি চরিত্র গঠনমূলক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে।
রাষ্ট্রনির্মাণে এবিভিপি-র অবদান বিচার করতে গেলে সত্তরের দশকের কথা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিহারে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে এবিভিপি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। ১৯৭৫ থেকে ৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে বহু এবিভিপি কর্মীকে জেলে যেতে হয়েছিল। জাতীয় সংহতির কথা মাথায় রেখে ১৯৬৬ সালে সংগঠন চালু করে সেইল বা স্টুডেন্টস এক্সপিরিয়েন্স ইন ইন্টার-স্টেট লিভিং প্রকল্প। এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা দেশের অন্য প্রান্তে কিছুদিন থেকে সেখানকার ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্য খোঁজার এই প্রয়াস আজও প্রাসঙ্গিক।
বর্তমানে এবিভিপি শিক্ষা সংস্কার, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয়। রক্তদান শিবির, পরিচ্ছন্নতা অভিযান থেকে শুরু করে মণিপুরের বন্যার মতো দুর্যোগে ত্রাণ কাজেও সংগঠনের কর্মীদের দেখা যায়। প্রায় আট দশক ধরে এই সংগঠন থেকে উঠে এসেছেন এমন বহু মানুষ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে দেশের সরকারি ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রয়াত অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি তার মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য নাম।
৭৮ বছর পেরিয়ে এসে এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়, ছাত্র শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়, আজকের দিনেও সে দেশ গড়ার কাজে সমান অংশীদার। ছাত্রশক্তি থেকে রাষ্ট্রশক্তি, এই ভাবনাতেই ধরা আছে এবিভিপি-র প্রায় আট দশকের যাত্রার সারকথা। একটি ছাত্র সংগঠনের এত দীর্ঘ ও ধারাবাহিক পথচলা ভারতীয় গণতান্ত্রিক জীবনের পক্ষে নিজেই একটি বার্তা বহন করে।
কলমে: উতঙ্ক ব্যানার্জী