লেখক: উতঙ্ক ব্যানার্জি (Utank Banerjee)
গণতন্ত্রের নিয়ম খুব সহজ, একই নির্বাচন কমিশনের অধীনে জিতলে নির্বাচন সৎ, আর হারলেই নির্বাচন ‘Rigged’, দুটি কথা একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।
২০২৬ এর নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। অথচ একই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই কেরল, তামিলনাড়ু-সহ দেশের অন্য রাজ্যেও নির্বাচন পরিচালনা করেছে। কেরলে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন UDF স্পষ্ট জয় পেয়েছে; তামিলনাড়ুতেও ফল বিজেপির অনুকূলে যায়নি। অতএব, কোনও রাজ্যের ফল নিজের রাজনৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে না মিললেই গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন ওঠে, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা কি প্রতিষ্ঠানের কাজ দিয়ে বিচার হবে, না নির্বাচনের ফল দিয়ে?
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি মন্তব্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন:
“প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট বছর নির্বাচন কমিশন মূলত এক সদস্যের প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, কমিশন থেকে অবসর নেওয়ার পর কেউ গভর্নর হয়েছেন, কেউ সাংসদ হয়েছেন, আবার কেউ লোকসভা নির্বাচনে শ্রী এল. কে. আদবানির বিরুদ্ধেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর থেকেই বোঝা যায়, সেই সময়ে কমিশনে কেমন ধরনের মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হত। এমনকি সেই সময়ের কিছু প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অবসরের পরও আজ একই রাজনৈতিক দর্শনকে সমর্থন করে টুইট করেন, মতামত দেন এবং প্রবন্ধ লেখেন। এর অর্থ হল, নির্বাচন কমিশন এখনই প্রকৃত অর্থে সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে উঠেছে।”
এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অস্বীকার করা যায় না। Chief Election Commissioner (CEC) টি. এন. শেষন, ১৯৯৯ সালে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে এল. কে. আদবানির বিরুদ্ধে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
SIR-কে ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু আইনের প্রশ্নে অবস্থান এখন অনেকটাই পরিষ্কার। ২৭ মে ২০২৬, Association for Democratic Reforms v. Election Commission of India, 2026 INSC 564 মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision করার ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয় এবং বলে, নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য ভোটার তালিকা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মৃত ভোটার, duplicate entry, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ব্যক্তি বা আইনত অযোগ্য নাম যদি ভোটার তালিকায় থেকে যায়, সেই তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই SIR-এর মূল উদ্দেশ্য প্রকৃত ভোটারকে বাদ দেওয়া নয়; প্রকৃত ভোটারের ভোটের মূল্যকে সুরক্ষিত রাখা।
CEC জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যেও আরও একটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দেশব্যাপী SIR-এর মূল সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী পর্যায়ের সময়সূচি তিন কমিশনারের সর্বসম্মত অনুমোদনেই গৃহীত হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশন অবশ্যই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু প্রশ্নেরও একটাই মানদণ্ড থাকা উচিত। জিতলে কমিশন নিরপেক্ষ, হারলেই কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট, এই যুক্তি কোনও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক অবস্থান নয়। নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ফলাফলের রঙ দেখে বদলাতে পারে না।